ঢাকা | সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পড়ে আছে হাজার বছরের প্রাচীন জৈন্তা রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ

রেজাউল হক ডালিম, জৈন্তাপুর থেকে ফিরে : প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৮-২০১৭ ইং । ১১:১৪:০৭

জৈন্তা বা জৈন্তিয়া এক সময় অতিপ্রাচীন স্বাধীন ও সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল। বর্তমান সিলেট জেলার উত্তর পূর্বাংশে জৈন্তাপুর উপজেলা, কানাইঘাট উপজেলা, গোয়াইনঘাট উপজেলা ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার দুটি ইউনিয়ন সমেত সমতল ভূমির ১৭ পরগণা, সমগ্র জৈন্তিয়া পাহাড় এবং আসামের নওঁগা জেলার কিয়দাংশ নিয়ে এই রাজ্য বিস্তৃত ছিল। প্রায় হাজার বছরের প্রাচীন এ রাজ্যের গোড়াপত্তন নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।
কারো কারো মতে,একদশ শতাব্দীতে জৈন্তিয়ায় কামদেব নামক এক নৃপতি রাজত্ব করতেন বলে জানা যায়। তবে এর অফিসিয়েল লিখিত কোন ইতিহাস গ্রন্থ বা দলিল না থাকায় কিংবদন্তি ও জনশ্রুতি এবং পরবর্তীতে আব্দুল আজিজ গং লিখিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে জানা যায় যে, প্রথমে হিন্দু নৃপতিদের দ্বারা এ রাজ্য শাসিত হত। হিন্দু নৃপতিগণ যথাক্রমে ০১) কেদাশ্বর রায়, ২) ধনেশ্বর রায়, ৩) কন্দর্প রায়, ৪) জয়ন্ত রায়। তবে এদের শাসনকাল সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়নি। একাদশ শতাব্দীতে কামদেব নামক এক রাজা শাসন করেছিলেন বলে জানা যায় এবং তাকে জৈন্তা রাজ্যের প্রথম শাসক বা রাজা হিসেবে প্রতীয়মান হওয়ার কারনে একাদশ শতাব্দীতে জৈন্তা রাজ্যের উৎপত্তি বলে ধরে নেওয়া হয়। জৈমিনি মহাভারত গ্রন্থের উদ্ধৃতি অনুসারে এ রাজ্যের বয়স প্রায় পাঁচ হাজার বছর।

কোনো কোনো গবেষকের মতে, প্রথমে যে ৪জন হিন্দু রাজার নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রাজা জয়ন্ত রায় প্রথম এ রাজ্য রাজত্ব করেন বলে জানা যায় এবং তার নামানুসারেই অর্থ্যাৎ জয়ন্ত থেকে পরিবর্তিত হয়ে জৈন্তা মতান্তরে জৈন্তিয়া নামের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ঘটে। মিষ্টার গেইট লিখিত আসামের ইতিহাস গ্রন্থেও এ ধরণের বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন জৈন্তা রাজ্যের রাজধানী ছিল খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের নরতিয়াং নাম স্থানে। পরবর্তীতে রাজা লহ্মী নারায়নের সময় ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান জৈন্তাপুর উপজেলা সদরের নিজপাঠ নামক অঞ্চলে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। রাজ্যের রাজকীয় প্রতীক হিসেবে সিংহের প্রতিমূর্তি ব্যবহার করা হতো। জৈন্তা রাজ্যের আলাদা মুদ্রা ছিল। জৈন্তা রাজা কর্তৃক ১৫৮৫ খ্রিষ্ঠাব্দে ভারতের অহম রাজ্যের রাজাকে লিখা এক চিঠির বক্তব্য অনুসারে জৈন্তা রাজ্যের ভাষা ছিল “বাংলা”। এ রাজ্যের প্রাচীন রাজধানীতে এখনো অনেক প্রতœতাত্বিক নির্দশন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো মেঘালিথিক পাথর। যাহা দৈর্ঘ্যে ৭-৮ ফুট এবং প্রস্থে ৩-৪ ফুট এবং এগুলোর পেছনে দাড়ানো অবস্থায় ৮-১০ ফুট লম্বা চোখা আকৃতির পাথর রয়েছে। ধরে নেওয়া হচ্ছে যে এতো বিশাল আকারের পাথর দেশের কোথাও আছে কি না সন্দেহ।
এ গুলোর মধ্য থেকে কমপক্ষে একটি পাথর ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে দাবি উঠেছে। আমি এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রাচীন জৈন্তা রাজ্যের অফিসিয়েল কোন লিখিত তথ্যাদি বা ইতিহাস অপ্রতুল হওয়ায়, অনুসন্ধানীরা ও গবেষকরা জনশ্রুতি, শিলালিপি, শিলাস্মৃতি ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যের বিভিন্ন গ্রন্থাদি পর্যালোচনা করে ইতিহাসে এ রাজ্যের স্থান করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং বর্তমানেও তা চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান ও গবেষণা থেকে পরিলক্ষিত হয় যে, জৈন্তারাজ্যের শৌর্যবীর্য এবং প্রশাসনিক কাঠামো সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। বলা যেতে পারে মোগলরা যখন সমস্তু উপমহাদেশে তাদের শাসন-শোষণ অব্যাহত রেখেছিল তখনও জৈন্তা রাজ্যের সিংহপুরুষরা জৈন্তা রাজ্য স্বাধীন রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাছাড়াও দীর্ঘদিন ব্যাপী শিয়ালের মত ধূর্ত ইংলিশরা উপমহাদেশের সমস্ত এলাকা দখলে নিলেও জৈন্তা রাজ্য কাবুতে নিতে পারেনি। জাফলং ‘বল্লাপুঞ্জী রাজবাড়ী’: সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইংলিশ রবার্ট লিন্ডসে তার আত্মজীবনী গ্রন্থে জৈন্তা রাজ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমাদের সীমান্তের নিকটতম প্রতিবেশী জৈন্তা রাজ্যের খাসিয়া রাজা ছিলেন বেশ সুসভ্য এবং শক্তিশালী। উল্লেখ্য যে, ইংলিশ প্রতিনিধি রাবার্ট লিন্ডসে সিলেটের রেসিডেন্ট হিসেবে ১৭৭৮ খ্রিষ্ঠাব্দে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৭৭৮ থেকে ১৯৩৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত বহুবার জৈন্তা রাজার সৈন্যদের সাথে ইংলিশরা যুদ্ধে লিপ্ত হয় কিন্তু কখনো পরাজিত করতে পারেননি।
অবশেষে ১৮৩৫ খ্রিষ্ঠাব্দে রাজা ইন্দ্র সিংহকে বন্দি করে কপট মিথ্যাবাদি ইংলিশরা রাজ্যটি দখল করে নেয় এবং এর সাথে সাথে জৈন্তার স্বাধীনতা সূর্য অস্তর্মিত হয় এবং রচিত হয় এক কালো অধ্যায়ের। জৈন্তা রাজ্যের এক অনন্য কিংবদন্তী হল সমতল ভূমির ১৭ পরগণার সালিশ কমিটি বা কমিটমেন্ট, যা আজো সামাজিক ন্যায় বিচার আচারের কাজে ও ঝগড়া বিবাদ মিমাংসার কাজে প্রতীয়মান হয়। অত্র অঞ্চলে কোন সমস্যা বা ঝগড়াঝাটি হলে ১৭ পরগণার মুরব্বিরা বসেই সমাধান করে দিতেন এবং সকলেই বিনা বাক্যে তা মেনে নিতো, এখনো বিভিন্ন সময়ে তা প্রতীয়মান হয়। সুশৃঙ্খল সমাজ বিনির্মানে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় এমন প্রত্যয় বিরলই বলা চলে। বিভিন্ন লেখকের লেখা থেকে ২৩ জন রাজার নাম সংগ্রহ করা গেছে। তারা হলেনঃ ১। রাজা পর্বত রায়, ২। রাজ মাঝ গোসাই, ৩। রাজা বুড়া পর্বত রায়, ৪। রাজা প্রথম বড় গোসাই, ৫। রাজা বিজয় মানিক, ৬। রাজা ধন মানিক, ৭। রাজা যশো মানিক, ৮। প্রতাপ রায়, ৯। রাজা সুন্দর রায়, ১০। ছোট পর্বত রায়, ১১। রাজা যশোমন্ত রায়, ১২। রাজা বান সিংহ, ১৩। রাজা প্রতাপ সিংহ, ১৪। রাজা লহ্মী নারায়ন, ১৫। রাজা রামসিংহ, ১৬। রাজা জয়ন্ত নারায়ন, ১৭। রাজা দ্বিতীয় বড় গোসাই, ১৮। রাজা চত্র সিংহ, ১৯। রাজা যাত্রা নারায়ন সিংহ, ২০। রাজা বিজয় সিংহ, ২১। রাজা লহ্মী সিংহ, ২২। রাজা দ্বিতীয় রাম সিংহ, ২৩। রাজা ইন্দ্র সিংহ। কিন্তু এসব প্রাচিন প্রতœরতœ অযতœ-অবহেলা আর সংরক্ষনের কারণে বিলিন হয়ে যাচ্ছে কালে বিবর্তে। যদি সরকারে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে এসব সংরক্ষনের জন্য মাঝে মধ্যে লোক দেখানো একটি-দুটি প্রতিনিধি দল ঐ এলাকা পরিদর্শন করতে আসেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়।
দর্শনার্থীরা এসব প্রাচীন নির্দশন দেখতে শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ভিড় করছেন, সাথে জানতে পারছেন জৈন্তা রাজ্যর ইতিহাস। সাধারণ মানুষের দাবী এসব প্রচীন নির্দেশন সংরক্ষণ এখনই প্রয়োজন।
ডিআর/৮৪

শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।