ঢাকা | বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
মুক্তমত

‘ঈদ’-‘ইদ’ বানান বিতর্ক, বাস্তবতা ও একটি প্রস্তাব

মোঃ আব্দুল মালিক : প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৯-২০১৭ ইং । ১১:০২:২০

গত ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মানুযায়ি যখন কেউ কেউ ‘ঈদ’ বানান ‘ইদ’ অর্থাৎ ‘ঈ’ এর স্থলে ‘ই’ দিয়ে লিখে ঈদের শুভেচ্ছা জানান বা কোন কোন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ই’ কার দিয়ে ‘ইদ’ বানান লিখছেন তখন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে তীব্র বিতর্কের ঝড় উঠে।
যারা এই বিতর্কের সূত্রপাত করেছিলেন যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তার থেকে যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে-
১. ভারতীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেল প্রথমেই ‘ঈদ’ বানান ‘ই’ দিয়ে লিখে প্রচার করে তারপর বাংলা একাডেমীর পরিচালক শামসুজ্জামান খান বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলসহ গণমাধ্যমে গিয়ে ভারতীয়দের অনুসরণে ‘ঈ’ এর স্থলে ‘ই’ দিয়ে ‘ঈদ’ বানান লিখার পক্ষে ওকালতি করেন।
২. হিন্দুদের একজন দেবতার নাম ‘ইদ’। ভারতীয় হিন্দুরা আমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘ঈদ’ কে তাদের দেবতার নামে নামকরনের অপপ্রয়াস হিসেবে ষড়যন্ত্র করে কৌশলে ‘ইদ’ করতে চাচ্ছে আর আমাদের বাংলা একাডেমিসহ ভারতের কাছে নতজানু সরকার তা অবলিলায় মেনে নিচ্ছে।
৩. সরকার এবং বাংলা একাডেমি বেছে বেছে আমাদের মুসলিম ঐতিহ্যের স্মারক শব্দগুলো কাট ছাট করছে বা নির্বাসনে পাঠাচ্ছে ইত্যাদি।  এসব নেতিবাচক প্রচারের ফলে সাধারণ মানুষের মনে একধরনের ভ্রান্ত ধারণা জন্ম নিচ্ছে। শুধু সাধারন মানুষ নয় উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদাধিকারী, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের এমন মনোভাব প্রকাশের পর বিবেকের তাড়নায়  এই প্রয়াস।
সংক্ষেপে এই ধারণাগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করতে চাই।
১. ভারতীয় কোন টেলিভিশন চ্যানেল প্রথমে ‘ঈদ’ বানান ‘ই’ দিয়ে লিখে প্রচার করেছে তার কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় নি মানে আমি পাইনি।
২. হিন্দুদের কোন দেবতার নাম ‘ইদ’ তা অভিধান বা গুগল সার্চ করে বা হিন্দু ধর্মে অভিজ্ঞ কাউকে জিজ্ঞেস করে পাওয়া যায় নি।
৩. সরকার এবং বাংলা একাডেমি বেছে বেছে শুধু ইসলামি শব্দগুলো কাটছাট করছে বা নির্বাসনে পাঠাচ্ছে বা সরকার ইসলাম বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ তার কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি। বরং সরকার ইসলামের পক্ষে কাজ করছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আওয়ামীলীগ সরকার প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে ঘোষণা করেছে। তাছাড়া কওমী মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি, আলাদা কওমী মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড গঠন, আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, কয়েকটি সরকারী মাদ্রাসায় অনার্স -মাস্টার্স কোর্স চালু ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
প্রচারের ধরন থেকে মনে হচ্ছে রামু বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল দেশে সেরকম একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা বা সাম্প্রদায়িক উসকানির মাধ্যমে সরকার বা বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা বা জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলা ইত্যাদি। যে ভাবে ইতোপূর্বে প্রচার করা হয়েছিল দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে  চাঁদে দেখা গেছে। এটা এক ধরনের একটি অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রকৃত বিষয় হচ্ছে ১৯৮৮ সালের পূর্বপর্যন্ত যে বানান রীতি অনুসরণ করা হতো তা ছিল ১৯৩৬ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রণীত বানান রীতি। অবশ্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানানরীতি সর্বাধিক মান্য হলেও সর্বজনগ্রাহ্য ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  প্রমুখ সৃজনশীল সাহিত্যিকরা বিশ্বভারতী প্রবর্তিত  বানান রীতি অনুসরণ করতেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে বাংলাভাষীরা দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষা সংস্কারের জন্য ১৯৪৯ সালের ৯ই মার্চ তদানীন্তন পূর্ববাংলা সরকারের উদ্যোগে ‘পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি’ গঠিত হয়। উক্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন মৌলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ। এই কমিটির রিপোর্ট বিরোধীতার মুখে পড়ে বিধায় আলোর মুখ দেখেনি। তদানীন্তন বাংলা একাডেমির পরিচালক সৈয়দ আলী আহসানের নের্তৃত্বে ১৯৬৩ সালে বাংলা বানান সংস্কারের উদ্দেশ্যে আরো একটি কমিটি গঠিত হয়। উক্ত কমিটির সদস্য ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লা, ড. এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, মুহাম্মদ ফেরদাউস খান, মুনীর চৌধুরী, আবুল কাসেম প্রমুখ। এই কমিটি বাংলা বর্ণমালা থেকে ঙ,ঃ,ঈ এবং ‘ ী ’- কার বাদ দেবার সুপারিশ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ড: মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একান্ত আগ্রহে ১৯৬৭ সালের ২৮ শে মার্চ আরো একটি কমিটি গঠন করে।  উক্ত কমিটির সদস্য ছিলেন ড. এনামুল হক, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, কাজী দীন মুহাম্মদ, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, মুনীর চৌধুরী, আবুল কাশেম প্রমুখ। যতদূর জানা যায় উক্ত কমিটিও বাংলা বর্ণমালা থেকে ঈ, ঊ, ঐ, ঔ, ঙ, ঞ, ণ, ম এবং ঈ-কার, উ-কার, ঐ-কার, ঔ-কার ইত্যাদি বর্জন করার সুপারিশ করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বানানের নিয়ম সমিতি’ ১৯৮০ সালে বাংলা বর্ণমালা থেকে  ঙ,ঞ,ণ,ঈ-কার এবং য-ফলা বাদ দেয়ার সুপারিশ করে। অবশ্য উক্ত কমিটি গুলোর সুপারিশ কখনো কার্যকর হয়নি।
১৯৮৮ সালের অক্টোবরে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এর উদ্যোগে ‘ পাঠ্যপুস্তকে বাংলা বানানের সমতা বিধানের লক্ষে’ কুমিল্লার বার্ডে তিনদিন ব্যাপী এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত কর্মশালায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ড. আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় ‘পাঠ্য বইয়ের বানান’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। এই বইয়ের নিয়মানুযায়ি বোর্ডের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রিত হতে থাকে। এই সময় পাঠ্যবইয়ে বাড়ি, গাড়ি, পাখি ইত্যাদি বানান ‘ঈ’কারের স্থলে ‘ই’ কার দিয়ে ছাপা হয় এবং প্রায় সর্ব মহলে ব্যাপক সমালোচিত হয়। যা বর্তমানে সকলের কাছে গ্রহণীয়। ঐ সময় বাংলা বানানের যে সব নিয়ম করা হয় তন্মধ্যে অন্যতম ছিল - “ সকল অ-তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি , মিশ্র শব্দে কেবল ‘ই’ এবং ‘উ’ এবং এদের কার চিহ্ন  ‘ ি ’ ‘ ু’ ব্যবহৃত হবে। স্ত্রী ও জাতিবাচক শব্দেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
বাংলা বানানকে প্রমিত করার লক্ষ্যে তথা সর্বজনগ্রাহ্য করার উদ্দেশ্যে ১৯৯২ সালের এপ্রিলে বাংলা একাডেমি এক উদ্যোগ নেয়। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান কে সভাপতি, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, জামিল চৌধুরী, অধ্যাপক নরেন বিশ্বাসকে সদস্য  এবং বশীর আল হেলালকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির রিপোর্ট পুস্তিকাকারে ১৯৯২ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়। বানানের নতুন নিয়ম সম্পর্কে সরকারি , আধাসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ডিগ্রী কলেজ, দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক, মন্ত্রণালয়সমূহ এবং বাংলা একাডেমির ফেলো, জীবন সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে মতামত নেওয়ার জন্য পুস্তিকাটি প্রেরণ করা হয়। প্রাপ্ত মতামত সমূহ পর্যালোচনা ও সংশোধন করে বিশেষজ্ঞ কমিটি পরিমার্জিত ও সংশোধিত সংস্করণ ১৯৯৪ সালে প্রকাশ করে। এই প্রমিথ বাংলা বানানের নিয়মানুযায়ি প্রকাশিত হয় ‘বাংলা একাডেমি বাংলা বানান অভিধান।’ এই অভিধানের পরিশিষ্টে বানানের নতুন নীতিমালা সংযোজন করা হয়। এই নিয়মে লিখা ছিল- “সকল অ-তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্রশব্দে কেবল ‘ই’ এবং ‘উ’ এবং তাদের কার চিহ্ন ‘ি ’ ‘ ু’ ব্যবহৃত হবে।” প্রমিথ বানানের এই সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ি ‘বাংলা একাডেমি সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ প্রকাশিত হয়। ২০০০ সালে এই নিয়মের কিছু সুত্র সংশোধিত হয় এবং তা ‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ এর পরিমার্জিত সংস্করন ডিসেম্বর ২০০০ এর পরিশিষ্টে মুদ্রিত হয়।
২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরের পাঠ্যপুস্তকে এবং সরকারি বিভিন্ন কাজে বাংলা একাডেমি প্রণীত বানান রীতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম পর্যালোচনা ও  প্রয়োজনীয় পরিমার্জনার পর পূর্ণমুদ্রণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে সভাপতি, অধ্যাপক আব্দুল কাইয়ুম, জামিল চৌধুরী, ড. গোলাম মুরশীদ, অধ্যাপক মাহবুবুল হক, অধ্যাপক জিনাত ইমতিয়াজ আলী, ড. স্বরোচিষ সরকার ও আলতাফ হোসেনকে সদস্য এবং শাহিদা খাতুন কে সদস্য সচিব করে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে।
উক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি বিভিন্ন সময়ে একাডেমিতে কয়েকটি সভায় মিলিত হয়। সভাসমূহে ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ শীর্ষক পুস্তিকা ছাড়াও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত বাংলা বানানের নিয়ম বিস্তারিতভাবে আলোচনার পর ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ সেপ্টেম্বর ২০১২ এর পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশ করে। উক্ত নিয়মের ২.১ নিয়মে লিখা আছে, “সকল অতৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র শব্দে ই এবং উ এবং এদের কার চিহ্ন ি ,  ু  ব্যবহৃত হবে।” বাংলা বানানের এই প্রমিত নিয়ম পুস্তিকাকারে প্রকাশ করে।  বাংলা একাডেমি ২০/- টাকা মুল্যে ২০১২ সাল থেকে সর্বসাধারণের মধ্যে বিক্রি করছে।
উপর্যুক্ত পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় পাকিস্তান আমলে পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গে বাংলা বানান সংস্কারের নিমিত্তে যে সব কমিটি গঠিত হয় সে সব কমিটি ঈ ও ী-কার বাদ দেয়ার সুপারিশ করে। ১৯৮৮, ১৯৯২, ১৯৯৪ , ২০০০ ও ২০১২ সালে বাংলাদেশ টেক্সট বুক বোর্ড ও বাংলা একাডেমি বাংলা বানান সংস্কারে যে সুপারিশ করে তাতে সকল বিদেশি শব্দ ‘ই’ এবং ‘ি  ’-কার দিয়ে লিখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই নীতিমালা অনুযায়ি ‘ঈদ’ যেহেতু বিদেশি তথা আরবি শব্দ সেই হিসেবে ‘ই’ দিয়ে লিখার কথা কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য প্রমিত বাংলা বানানের নীতিমালা অনুযায়ি পাঠ্যপুস্তক ও বাংলা অভিধান রচিত হলেও ‘ ঈদ’  বানান ‘ঈ’ দিয়ে লিখা অব্যাহত থাকে। এমন কী বাংলা একাডেমির নভেম্বর ২০১২ সালে প্রকাশিত বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ঈ এবং ই দিয়ে ‘ঈদ’ বানান লিখা আছে। গত ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে যখন কেউ কেউ ‘ই’ দিয়ে ‘ইদ’ বানান লিখতে শুরু করলেন বা বাংলা একাডেমি থেকে এই নিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে তখনই এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বিষয়টি মোটেই নতুন নয়, বিতর্কটি নতুন। তবে যারা এই বিতর্কে উচ্চকন্ঠ তারা যতটা না ঈ প্রীতি থেকে করছেন তার চেয়ে বেশি করছেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে। তা না হলে গত ঈদুল ফিতর বা কয়েক বছর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কিছু মানুষ সউদি আরবের সাথে রোযা রেখে ঈদ পালন করছে যা কুরআন সুন্নাহ বিরোধী। সউদি আরবের সাথে মিল রেখে ঐ দিনে  রোযা রাখা বা ঈদ উদযাপন করা যায় কিন্তু ইফতার বা সেহরী এই সময়ে করা যায় না। কারণ সৌদি আরবের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত বাংলাদেশের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়ের মধ্যে কয়েক ঘন্টার পার্থক্য রয়েছে। এই ছোট উদাহরণ থেকে সহজেই অনুমেয় করা যায় প্রাকৃতিক কারণেই ইসলাম ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো একই দিনে একই সময়ে সারা বিশ্বে পালন করা সম্ভব নয়, কাম্য নয়, বিধানও নয়। বরং রোযার দিন ঈদ করলে এবং ঈদের দিন রোযা রাখলে শক্ত গুনাহের কথা ধর্মীয় বিধানে উল্লেখ আছে। কিন্তু এই ব্যাপারে ঈদ বানান বিতর্ককারীদের সোচ্চার হতে দেখা যায় নি। ’
সে যাই হউক ঈদ শব্দটি বাঙালি মুসলমানরা স্বরণাতীত কাল থেকেই ‘ঈ’ দিয়ে লিখে এমনভাবে অভ্যস্থ হয়েছেন সেখানে ই দিয়ে লিখতে, দেখতে তৃপ্তি পাচ্ছেন না। তাই সাধারণের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ বিরাজমান। ঈদ শব্দটি শুধু বাঙালি মুসলমানের আবেগ-অনুভতির সাথে জড়িত নয়। এর সাথে আরবি ভাষা  ও ব্যাকরণের নিয়মও জড়িত। একজন বাঙালি মুসলমানের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি যেমন আবেগ অনুভতি রয়েছে তেমনি রয়েছে আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির  প্রতিও। আরবি বর্ণমালায় তিনটি স্বরবর্ণ আছে -আলিফ, ওয়াও এবং ইয়া। এগুলো যখন শব্দে ব্যবহৃত হয় তখন পুর্ববর্তী বর্ণের ধ্বনি দীর্ঘ হয়। ঈদ বানানটি লেখা হয় আইন, ইয়া ও দাল দিয়ে।
অতএব আরবি ভাষা ও ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ি ঈদ বানানের ইয়া এর পূর্বের আইন দীর্ঘস্বর হবে। অর্থাৎ বাংলায় ঈ হবে। ঈদ বানান দীর্ঘস্বরই হবে। বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নীতিমালার ২.৪ নং এ ং, ঙ এর ব্যবহারের নিয়মে বলা হয়েছে শব্দের শেষে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সাধারণভাবে অনুস্বার(ং) ব্যবহৃত হবে। তবে অনুস্বারের (ং) সঙ্গে স্বরযুক্ত হলে ‘ঙ’ হবে। যেমন, বাঙালি, ভাঙ্গা ইত্যাদি তবে বাংলা ও বাংলাদেশ শব্দে অনুস্বার থাকবে। আরবি ব্যাকরণের নিয়ম, বাঙালি মুসলমানের আবেগ অনুভতির প্রতি শ্রদ্ধা ও অহেতুক বিতর্ক এড়ানোর জন্য ঈদ বানান ব্যতিক্রম হিসেবে ঈ-দিয়ে লিখা বিধি সম্মত করার জন্য বাংলা একাডেমির প্রতি আমি বিনীত প্রস্তাব করছি। কোন কোন বানান বাঙালির অস্থি মজ্জা ও মননে এমনভাবে গেঁথে গেছে যা অতি সতর্কতার সহিতও এড়ানো যাচ্ছে না। যেমন অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে যে বিশেষজ্ঞ কমিটি কর্র্তৃক ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’  ২০১২ পুস্তিকাটি রচিত, বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত। সেই পুস্তিকার প্রচ্ছদ পাতায় ‘একাডেমি’ বানানটি  ী-কার দিয়ে লিখা আছে ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘বাংলা একাডেমির প্রকাশনা’ পুস্তিকার ভেতরে একডেমী বানান কোন কোন ক্ষেত্রে ী-কার দিয়ে লিখা আছে। ‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ জানুয়ারি ২০১৪-এ একাডেমি বানান  ী-কার দিয়ে লিখা আছে। যে বিশেষজ্ঞ কমিটি, ব্যক্তিবগ, প্রতিষ্ঠান বাংলা প্রমিথ বানানের নিয়ম করছেন তারাই মনের অজান্তেই অনেক ক্ষেত্রে সেই নিয়ম ভঙ্গ করছেন। এর থেকে মজ্জা গত ধারণার গভীরতা সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করা যায়। সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে বাংলা একাডেমি এ বিষয়টি বিবেচনা করবেন এই প্রত্যাশা করছি।
লেখক : শিক্ষক, কলামিস্ট
ডিআর/৮৪

শেয়ার করুন
সর্বশেষ খবর মুক্তমত
  • আসুন ভালোবাসার লড়াই করি
  • রাস্তা ঘাটের বেহাল দশার জন্য দায়ী কারা?
  • বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আপনার করনীয়
  • সাইদুর এবং..
  • ‘বঙ্গশার্দূল’ ওসমানী অবহেলিত কেন ?
  • "খন্দকার মোশতাক চক্রের প্রেতাত্নারা নানা মুখোশে রাজনীতি করছে সর্বত্র"
  • নোবেল কি পাবেন শেখ হাসিনা?
  • ‘ঈদ’-‘ইদ’ বানান বিতর্ক, বাস্তবতা ও একটি প্রস্তাব
  • বাঙ্গালি দ্বারা রোহিঙ্গা নির্যাতন..!!!
  • হায় হেফাজত!
  • ‘আমরা সামরিক ভাষায় কথা বলতে চাই’
  • জনগণের হাতে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বিএনপি’র
  • কঠিন অগ্নি পরীক্ষার মুখোমুখি দেশ
  • প্রকৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির নাম বন্ধুত্ব
  • মাহবুব আলী খান 
  • বিএনপির রাজনৈতিক পুনর্বাসন রাষ্ট্র ক্ষমতা নাকি নির্বাসন?
  •   প্রবাসী বিএনপির কাণ্ডারি মুকিব : তপ্ত মরুর বুকে চাষাবাদ করছেন সবুজ ধানের শীষ
  • প্রসঙ্গ: ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদ নির্বাচন
  • তাদের নিরবতাই বড় প্রমাণ
  • ভুয়া অ্যাওয়ার্ডের মতোই কী রামপালের অনাপত্তি?
  • এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।