ঢাকা | সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
মুক্তমত

‘বঙ্গশার্দূল’ ওসমানী অবহেলিত কেন ?

আব্দুল হালিম সাগর : প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-১০-২০১৭ ইং । ০৯:৩২:৫৯

সিলেটবাসীর কাছে আজও অবহেলিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক সিলেটের কৃতীসন্তান বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী। এক সময় পাঠ্য পুস্তকে এই বীর সেনানীকে নিয়ে একটি অধ্যায় ছিলো ওসমানীকে নিয়ে। কিন্তু আজ সেই অধ্যায়টি নেই। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে ওসমানী এক মুছে যাওয়া ইতিহাসের নাম মাত্র। যথাযথ মূল্যায়ন আর সিলেটবাড়ী হওয়ার কারণে বিভিন্ন ভাবে অবহেলিত হচ্ছে এই বীর সেনানীর মান মর্যাদা। এক কথায় বঙ্গবীর ওসমানীর নাম আজ কালের গহব্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু সেই বীর সেনানীর সহজ সরল জীবনযাত্রার এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে আজকের ওসমানী যাদুঘর। সরকার,মন্ত্রী,এমপি,ডিসি,পুলিশ কমিশনার,ডিআইজি থেকে শুরু করে সরকার কিংবা বিরোধীদলীয় নেতাদের কাছে অবজ্ঞার নাম এম.এ.জি ওসমানী। সিলেট নগরীর ধোপাদিঘীর পার ও নাইওরপুলের মাঝামাঝি জায়গায় বঙ্গবীর এক নাম্বার ভাড়িটির আলিশান গেটের সামনে দাঁড়ালেই হাতছানি দেবে বঙ্গবীর ওসমানীর স্মৃতি বিজড়ীত জাদুঘরটি। মাতৃভূমির জন্য একজন দেশপ্রেমিক মানুষের নিখাদ ভালোবাসা, সততা ও কর্মনিষ্ঠার অনুপ্রেরণার উৎস এ জাদুঘরটি আজ কালের সাক্ষি। ইতিহাসের কিংবদন্তি একজন কৃতি ব্যক্তিত্বের জীবনের নানা স্মৃতিকে ধারণ করে নতুন প্রজন্মকে অফুরন্ত প্রেরণার জোগান দিয়ে যাচ্ছে নুরমঞ্জিলে গড়ে উঠা ওসমানী জাদুঘরটি। কিন্তু যথাযথ মুল্যয়ন আর পৃষ্টপোষকতার কারণে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ভবনটি সংস্কার ও আধুনিকায়নে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ থেকে প্রমানিত হয় সিলেটবাসীর কাছে কত অবহেলিত এই বীর সেনানী। যাদুঘরটি প্রতিষ্টা হওয়ার পর আজ পর্যন্ত সিলেটের কোনো মন্ত্রীর পদচিহ্ন পড়েনি যাদুঘরটিতে জানালেন যাদুঘরটি বর্তমান পরিচালক মোঃ জিয়ারত হোসেন খান। একইভাবে আক্ষেপ করলেন, যাদুঘরে দীর্ঘদিন থেকে কর্মরত মুক্তিরচকের রাজা মিয়া, কুয়ারপারের নুর মিয়ার ছেলে আফতাব উদ্দিন বাচ্চু, কাজী মাহবুব আলম।
বাচ্চু মিয়ার পিতা নুর মিয়া ছিলেন বঙ্গবীর ওসমানীর বাসার তৎকালীন কেয়ারটেকার। তাঁর হাত ধরেই ওসমানীর সান্নিধ্য লাভ করেন বাচ্চু মিয়া, তিনি জানালেন আমি ১৯৮৪ সাল থেকে যাদুঘরে কর্মরত আছি। ১৯৯৬ সালে একবার এসেছিলেন সে সময়কার পৌর চেয়ারম্যান বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এরপর আর কোনো মেয়র কিংবা দলীয় নেতার পদ চিহৃ পড়েনী ওসমনী যাদুঘরে। আর বর্তমান পরিচালক মোঃ জিয়ারত হোসেন খান জানালেন, তিনি যোগদানের পর বিভিন্ন অনুষ্টানে সিলেটের অনেক রাজনীতিবিদ, মেয়র, কাউন্সিলার, সুশিল সমাজের নেতৃবৃন্দ, জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকদের যথাযথ ভাবে নিমন্ত্রন করা হয়। কিন্তু তারা কোনো দিনই আসেননি যাদুঘরের কোনো অনুষ্টানে। ওসমানী সিলেটের কৃতিসন্তান তাকে যদি সিলেটের মানুষ মুল্যায়ন না করে তাহলে করবেটা কে? সিলেট নগরীর ধোপাদিঘীর পূর্বপাড় লাগুয়া নাইওরপুল এলাকার এই  বাড়িটির নাম ‘নূর মঞ্জিল’। এই বাড়িতে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটিয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। “নুর মঞ্জিল” এর মালিক ছিলেন ওসমানীর মাতা জোবেদা খাতুন। এ বাড়িতেই গড়ে উঠেছে ওসমানী যাদুঘর। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি সম্প্রসারণ জরুরী হয়ে পড়েছে। অপরদেক ওসমানী যাদুঘর আধুনিকায়ন করতে একটি পাঠাগার, একটি মিউজিয়া, একটি হলরুম নির্মান সময়ের দাবী। কারণ বৃষ্টির মৌসুমে সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরে ভিতরে পানি প্রবেশ করে। বিষয়গুলো অবশ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে জানিয়েছেন জিয়ারত হোসেন খাঁন। লে.জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী ১৯১৮  সালের ১লা সেপ্টেম্বর  তৎকালীন বৃহত্তর সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমায় জন্ম  গ্রহণ করেন। ওসমানীর  পৈতৃক নিবাস বর্তমান সিলেট  হতে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে বালাগঞ্জ থানার (বর্তমান ওসমানীনগর  উপজেলা) দয়ামীর  গ্রামে। ওসমানীর পিতা মরহুম খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে সদস্য হিসাবে সরকারী বিভিন্ন  উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবীর ওসমানীর রতœগর্ভা মাতার নাম মরহুম জোবেদা খাতুন ছিলেন একজন বিদে্যুৎসাহী ধার্মিক রমণী।
ওসমানী বড় ভাইয়ের নাম মুহম্মদ নূরুল গণি ওসমানী ও মেঝো বোনের নাম সদরুননেছা। মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী  ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। খান বাহাদুর মফিজুর রহমানের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন ওসমানী।  রতœগর্ভা মাতা জোবেদা খাতুন ওসমানীকে ছোট বেলায় আদর করে  আতা বলে ডাকতেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি  অবিস্বরণীয় নাম বঙ্গবীর জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি  ওসমানী। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সমর নায়ক, খাঁটি দেশপ্রেমিক, সত্যের পুজারী, বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ, রনাঙ্গণের  সাহসী বীর, আজীবন গণতন্ত্রের  আদর্শে বিশ্বাসী, মুক্তিযুদ্ধের বীর সূর্যসন্তান-সর্বাধিনায়ক এবং একজন ক্ষণজন্মা দুরদর্শী চিন্তা চেতনার অধিকারী।  নিজ  মেধা  বলে ওসমানী  ১৯৩৯ সালে ভূগোলে এমএ প্রথম পর্ব পড়ার সময় জুলাই মাসে বৃটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৪০ সালে ইন্ডিয়ান মিলিটারী একাডেমী দেরাদুন থেকে সামরিক শিক্ষা শেষ করে বৃটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কমিশন অফিসার হিসেবে নিয়োজিত  হন। নিজ কীর্তি ও  কার্যকলাপের মাধ্যমে যোগ্যতা প্রদর্শন করে ১৯৪১ সালে ১৭ই ফেব্রুয়ারি ক্যাপ্টেন পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং  ১৯৪২ সালে ফেব্রুয়ারি  মাসে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ আর্মির সর্ব কনিষ্ট মেজর পদে উন্নিত হন। এটা এক বিরল সম্মান।১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তিনি পাকিস্তানে আগমন  করেন এবং পাক সেনাবাহিনীর গঠন কাজে শরীক হন। এ সময় তিনি দক্ষতা, সাহসিকতা ও ধৈর্য্যরে সঙ্গে কর্তব্য পালন করে ১৯৪৭ সালে ৭ অক্টোবর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পাকিস্তান  সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, এবং ১৯৪৮ সালে  পশ্চিম পাকিস্তানে কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পিএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে ১৬ মে কর্ণেল পদে পদোন্নতি পেয়ে দেশ রক্ষা পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে সংযোজন কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৬১ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রতিনিধি  ও মুখপাত্র মনোনীত হন। ১৯৬৫ সালে  ওসমানী পাক-ভারত যুদ্ধে পশ্চিম রণাঙ্গণে ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারী অপারেশন হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তিনি  ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের দু’টি ব্যাটেলিয়ানের স্থলে ছয়টি ব্যাটেলিয়ান গঠন করেন। অনেক প্রতিরোধ ও প্রতিকুলতার সম্মুখীন হয়েও তিনি ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের উন্নয়ন ও সেনাবাহিনীতে বাঙ্গালী সৈন্যের কোটা বৃদ্ধির ব্যাপারে  সফল হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে  ১৬ ফেব্রুয়ারি  ওসমানী  পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একজন কর্ণেল পদে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে অবসর  গ্রহণ করেন। পাক আর্মিতে অবস্থানকালীন তিনি ‘টাইগার ওসমানী’ ‘পাপা টাইগার’ ‘বঙ্গশার্দূল’ ইত্যাদি নামে সুপরিচিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে সাড়া দিয়ে ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে তার রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর কতিপয় বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর তিনি আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক  সাধারণ  নির্বাচনে জনগন  বিপুল ভোটে আওয়ামীলীগকে জয়ী করেন। ওসমানী নিজেও এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হন। বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল  মন্ত্রী সভায়  যোগদান করেন। তিনি ১৯৭২ সনের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীন নৌ ও বিমান মন্ত্রী কেবিনেটের সদস্য হিসাবে শপথ  গ্রহন  করেন। বঙ্গবীর ওসমানী ১৯৭৬ সালে ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর স্বপ্ন ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’  পুনঃ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে “জাতীয় জনতা পাটি” নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এই সৎ মানুষটির অটল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে কারণে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সে কারণে তিনি জীবনের শেষ দিন অবধি গণতন্ত্র ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের জন্য নিজের সর্বস্ব উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীনসময়ে নুর মঞ্জিল নামের বাড়িটি বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গুলি করে ধ্বংস করে দেয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা পরবর্তী  সময়ে ওসমানী সিলেট শহরে ফিরে এসে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িটি দয়ামীর গ্রামের কিছু সম্পদ বিক্রয় করে মেরামতের মাধ্যমে কোন রকমে বাসোপযোগী করে তোলেন। চাকুরি থেকে অবসরকালীন সময়ে কর্নেল ওসমানী এই ভবনে বেশ কিছুদিন বসবাসও করেন। ওসমানী  ছিলেন চিরকুমার। জনৈক নুর মিয়া নামের কেয়ারটেকার সময়ে অসময়ে ‘নূর মঞ্জিল’  দেখাশুনা করতেন। বঙ্গবীর ওসমানী  জীবদ্দশায় তাঁর পিতা মাতার নামে ‘দি জুবেদা খাতুন খান বাহাদুর মফিজুর রহমান’ ট্রাষ্ট গঠন করেন। বঙ্গবীর ওসমানীর মৃত্যুর পর মূলত এ বাড়িটি তালাবদ্ধ থাকত।
১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মহান জননেতা সমর নায়ক বঙ্গবীর জেনারেল এম এ জি ওসমানী  লন্ডনের  সেন্টপল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর ইচ্ছায় তাকে  হযরত শাহজালাল (রহঃ) দরগার  শরীফ সংলগ্ন তাঁর মায়ের কবরের সন্নিকটে সমাহিত করা হয়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন সরকার ট্রাষ্টের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ওসমানীর ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের জন্য এককালীন ৫লক্ষ টাকার বিনিময়ে বাড়িটি লীজ গ্রহন করে। লীজ গ্রহন শেষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রনে সিলেটের নূর-মঞ্জিল ভবনটিকে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার দায়িত্ব অর্পন করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ওসমানীর স্মৃতি রক্ষার্থে সিলেটের নূর-মঞ্জিল ভবনটিকে অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে জাদুঘর রূপান্তর করণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে দায়িত্ব পালন করে মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর বাস ভবনটি ওসমানী জাদুঘরে রূপান্তর করে। বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীর  জীবন সম্পর্কিত নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ  সেবায় তাঁর গৌরবময় অবদান ও স্বীকৃতি জাতির সামনে তুলে ধরতে কর্মময়, সামাজিক, রাজনৈতিক স্মৃতি বিজড়িত নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধ তথা জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে ওসমানী জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়।  যতদূর জানা যায়, বঙ্গবীর ওসমানীর মৃত্যু পর ১৯৮৪ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকার সিলেটে ওসমানীর নামে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সে অনুযায়ী জুবেদা খাতুন খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্টের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ৯৯ বছরের জন্য ধোপাদীঘির পারের বাড়িটি লিজ নেয় সরকার। জাদুঘরটি ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা মার্চ এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এবং সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল  হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ উদ্বোধন করেন। এই বঙ্গবীরের ব্যবহৃত নানা প্রকার নিদর্শন উপস্থাপনার মাঝে এই জাদুঘরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এটি বাংলাদেশের প্রথম স্মৃতি জাদুঘর। বাংলাদেশের কৃতি সন্তানদের শ্রদ্ধার দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের এটি একটি শাখা জাদুঘর। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ওসমানী জাদুঘরের সকল কার্যক্রম পরিচালনা  করে থাকে।
কি আছে ওসমানী যাদুঘরে: ওসমানী জাদুঘরে তিনটি গ্যলারী ও স্টোরসহ বর্তমানে ৪৭৫টি নিদর্শন রয়েছে, বঙ্গবীর ওসমানীর ব্যবহৃত নানা ধরনের সাধারণ পোষাক-পরিচ্ছদ, সেনাবাহিনীর উর্দি,পত্র-পত্রিকা,সাময়িকী, দেশী-বিদেশী জার্নাল, বিভিন্ন লেখকের গ্রন্থ, বেতের চেয়ার, কাঠের আলমারি, বইয়ের শোকেচ, আলনা, সামরিক ছড়া, টেলিফোন সেট, শার্ট-প্যান্ট, সুয়েটার বালিশ, তোয়ালে, পাঞ্জাবী ব্রীফকেস, জামা, জুতা, চীনা মাটির বাসন-কোসন, চামচ, ছুরি, কাঠের নৌকা, ফাক্স, টি-টেবিল ও ছাতা। ছোট বেলায় পিতার কোলে ওসমানী, যৌবনে সামরিক বাহিনীর অফিসার হিসেবে জেনারেল ওসমানী,সামরিক পোষাকে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ওসমানী, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জেনারেল ওসমানীর ছবি ইত্যাদি সুন্দর করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ওসমানীর ব্যবহৃত মনোগ্রাম, পদক, ব্যাজ, শোল্ডার ব্যাজ, টুপীর ব্যাজ, বুজের ব্যাজ,  বুকের ব্যাজ ভুজারী, তরবারী,  পাসর্পোট,  স্বাধীনতা পুরস্কার।সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বেতের সোফাসেট, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সেবাবাহিনীর গার্ড অব অনার  গ্রহণরত  জেনারেল ওসমানী।  সিলেট  বিমানবন্দরে বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর বিমান থেকে অবতরণরত মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক  জেনারেল ওসমানী।  ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও সহকর্মীদের সঙ্গে জেনারেল ওসমানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  সাথে ওসমানী। রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে ওসমানী, জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাথে ওসমানী, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালীন যশোহরের হানাদার বাহিনী মুক্ত অঞ্চল পরিদর্শনরত জেনারেল ওসমানী। রনাঙ্গণে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও কৌশল সম্পর্কে সেক্টর কমান্ডারদের নির্দেশ দানরত জেনারেল  ওসমানী, রনাঙ্গণে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী   রণাঙ্গন ও মুক্তাঞ্চাল পরিদর্শনে জেনারেল ওসমানী। ১৯৭১সালের  ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ পাক বাহিনীর  আত্মসমার্পন  দৃশ্যের পিছনে ও  মুক্তিযোদ্ধা ও জনতা, ভারতে অবস্থিত শরণার্থী  শিবিরে অবস্থানরত নর-নারী ও শিশুদের করুন অবস্থা, ২৫ মার্চ ১৯৭১ কালো রাত্রি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল সমূহে পাক বাহিনীর গণহত্যা ইত্যাদি ওসমানী জাদুঘরের গ্যালারীতে রয়েছে। এছাড়াও বঙ্গবীর ওসমানীর ব্যবহৃত একটি ছোট খাট, যে খাটে তিনি শুতেন। খাবার  টেবিল, জায়নামাজ, বিভিন্ন ধরনের মানপত্র, চীনামাটির তৈরী প্লেট হাফ -প্লেট, কারিডিস, রেফ্রিজারেটর, মুক্তিযুদ্ধকালীন  অপারেশনের  ম্যাপ, বিভিন্ন  ধরনের সাময়িকী, জেনারেল ওসমানী ব্যবহৃত টেবিল ও চেয়ার। এডমিরাল এম এ খানের পাশে ওসমানী, হযরত  শাহজালাল (রাঃ) এর   মাজার জিয়ারতে জেনারেল ওসমানী, দেওয়ান ফরিদ গাজী  ও মেজর চিত্তরঞ্জন দত্তের সাথে জেনারেল ওসমানী। স্বতঃস্ফুর্ত জনতার মাঝে জেনারেল ওসমানী, ১৯৭২ সালে সিলেটের একটি এলাকায় জনগনের  আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করছেন জেনারেল ওসমানী। ১৯৭২ সালের গোড়ার দিকে প্রথমবারের মত সদ্য স্বাধীন  বাংলাদেশের সিলেট বিমান বন্দরে জেনারেল ওসমানী। সিলেটের জনগণের পাশে ভাষণরত ওসমানী। এসব আলোকচিত্রে ওসমানী নামক মহাপুরুষকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।ওসমানী জাদুঘরের ভবনটি দৃশ্যত, সাধারনত বাংলোর মত। অনেকটা চৌচালা ঘরের আকৃতি, টিনের চাল। এ ছাড়া সস্মুখ ভাগে  দু’দিকে দ’ুটি ছোট ছোট কামরা রয়েছে। এ দু’টি বর্তমানে জাদুঘরের অফিস পিছনে আরেকটি কক্ষ রয়েছে। সম্মুখ ও পিছন  ভাগে রয়েছে প্রশস্ত খালি জায়গা। ভবনের সামনে ও পিছন দিকে অনেক নানা জাতের গাছ-গাছালি। ব্যক্তিগত জীবনে ওসমানী যে কত সহজ সরল সাধারন জীবন যাপন করতেন তা-জাদুঘর পরিদর্শন না করলে জানা যায় না। ওসমানী জাদুঘর সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে এবং সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ডিআর/৮৪

শেয়ার করুন
সর্বশেষ খবর মুক্তমত
  • রাস্তা ঘাটের বেহাল দশার জন্য দায়ী কারা?
  • বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আপনার করনীয়
  • সাইদুর এবং..
  • ‘বঙ্গশার্দূল’ ওসমানী অবহেলিত কেন ?
  • "খন্দকার মোশতাক চক্রের প্রেতাত্নারা নানা মুখোশে রাজনীতি করছে সর্বত্র"
  • নোবেল কি পাবেন শেখ হাসিনা?
  • ‘ঈদ’-‘ইদ’ বানান বিতর্ক, বাস্তবতা ও একটি প্রস্তাব
  • বাঙ্গালি দ্বারা রোহিঙ্গা নির্যাতন..!!!
  • হায় হেফাজত!
  • ‘আমরা সামরিক ভাষায় কথা বলতে চাই’
  • জনগণের হাতে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বিএনপি’র
  • কঠিন অগ্নি পরীক্ষার মুখোমুখি দেশ
  • প্রকৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির নাম বন্ধুত্ব
  • মাহবুব আলী খান 
  • বিএনপির রাজনৈতিক পুনর্বাসন রাষ্ট্র ক্ষমতা নাকি নির্বাসন?
  •   প্রবাসী বিএনপির কাণ্ডারি মুকিব : তপ্ত মরুর বুকে চাষাবাদ করছেন সবুজ ধানের শীষ
  • প্রসঙ্গ: ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদ নির্বাচন
  • তাদের নিরবতাই বড় প্রমাণ
  • ভুয়া অ্যাওয়ার্ডের মতোই কী রামপালের অনাপত্তি?
  • মানুষ গড়ার চাকাটা ‘পাংচার’ হয়ে যাচ্ছে যে!
  • এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।