ঢাকা | সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
কৃষি

মরিচের বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে নেই হাসি

সংবাদদাতা, পঞ্চগড় : প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৬-২০১৭ ইং । ০৬:২৭:৩৩

কাঙ্খিত দাম না পাওয়ায় পঞ্চগড়ে গ্রীষ্মকালীন মরিচের বাম্পার ফলনেও হাসি নেই কৃষকের মুখে। জেলার বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে চাষ হওয়া মরিচ স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ হলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মরিচের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাল ফলন পেয়েও পর্যাপ্ত দাম না থাকায় বিপাকে পড়ছেন জেলার মরিচ চাষীরা। কৃষকদের অভিযোগ, এই ভরা মৌসুমে ভারতীয় (এলসি) মরিচ আমদানী করায় দাম নেই তাদের উৎপাদিত মরিচের।
পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মরিচ চাষ হয় আটোয়ারী উপজেলায়। গত মৌসুমে পঞ্চগড় জেলার এক হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষ হয়েছিল। এই সুবাদে চলতি মৌসুমে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ হাজার ২৫০ হেক্টর। কিন্তু চাষ হয়েছে ৯ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমিতে। অন্যদিকে মরিচের উৎপাদন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১১ হাজার ৮৬ মেট্রিকটন আর উৎপাদন হয়েছে ১৮ হাজার ৯৯৫ মেট্রিকটন। এর মধ্যে শুধু আটোয়ারী উপজেলায় ৪ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে ৯ হাজার ৩৫০ মেট্রিকটন মরিচ উৎপাদন হয়েছে।
এই জেলায় এবার স্থানীয় জাতের মরিচ ছাড়াও উচ্চফলনশীল (হাইব্রিড) জাতের বাঁশগাইয়া, মল্লিকা, বিন্দু, হট মাষ্টার, সুরক্ষাসহ বিভিন্ন জাতের মরিচের ব্যাপক চাষ হয়েছে।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, প্রতি বিঘা জমিতে কাঁচা মরিচ উৎপাদন হয় ২৮ থেকে ৩২ মণ। আর কাঁচা মরিচ শুকনা করা হলে বিঘায় হয় ১০ থেকে ১২ মণ। প্রতি বিঘা মরিচ চাষে খরচ হয় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা।
এক সময় এ জেলার কৃষকেরা নিজের প্রয়োজনে বাড়ীর আশপাশের অল্প কিছু জমিতে মরিচ চাষ করে থাকেলও এখন অনেক কৃষক বাণীজ্যিক ভিত্তিতে মরিচ চাষ করছেন। অল্প জমিতে বেশী ফলন এবং অধিক মুনাফা পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে মরিচ উৎপাদনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। উঁচু যেসব জমিতে অন্য ফসল ভাল হয় না সেসব জমিতে কৃষকরা মরিচ চাষ করে গত কয়েক বছর ধরে লাভবান হচ্ছিলেন। তবে, হঠাৎ করে মরিচের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় বিপাকে পড়েছেন মরিচ চাষীরা। উৎপাদন খরচও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। গত বছর প্রতি ঢাকি (মরিচ রাখার বাঁশের পাত্র) মরিচ তুলতে শ্রমিকদের দিতে হতো ২০ টাকা। এবার সেখানে প্রতি ঢাকি মরিচ তুলতে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দিতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ উঠিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
জেলার আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর এলকার মরিচ চাষী আব্দুল করিম বলেন, ‘গত বছর আড়াই বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করে ৯০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করেছিলাম। এবারও আড়াই বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছি মরিচের ফলন ভাল হয়েছে কিন্তু এবার মরিচের দাম গত বছররের তুলনায় অর্ধেক।’
ভরা মৌসুমে সরকার ভারতীয় (এলসি) মরিচ আমদানী করায় তাদের উৎপাদিত মরিচের দাম কমে গেছে বলেও দাবী করেন তিনি।
আটোয়ারী উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া এলাকার মরিচ চাষী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর এই সময়ে প্রতি মণ শুকনা মরিচ বিক্রি হয়েছিল সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দরে। আর এবার প্রতি মণ শুকনা মরিচ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২৭’শ থেকে ২৮’শ টাকা দরে। মরিচের বাজারের এই অবস্থা থাকলে আমাদের কৃষকদের খরচ ওঠানোই কষ্টকর হয়ে যাবে।’
জেলার সদর উপজেলার ফুটকিবাড়ি বাজারের মরিচ ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার মরিচের দাম প্রায় অর্ধেক। এবার ভারতীয় (এলসি) মরিচ আসায় বাজারের এই অবস্থা হয়েছে। আমরা ব্যবসা করি আমাদের তেমন ক্ষতি নাই কম দামে কিনে কম দামেই বিক্রি করছি কিন্তু কৃষকদের ক্ষতি হচ্ছে প্রচুর।’
আটোয়ারী ফকিরগঞ্জ বাজারের মরিচ ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি মণ শুকনা মরিচ ২৭’শ থেকে ২৮’শ টাকা দরে কিনতেছি। আমরা এখান থেকে বরিশাল, ভোলা, চট্রগ্রাম সহ বিভিন্ন জেলায় এই মরিচ সরবরাহ করি। প্রতি মণ মরিচে আমাদের খরচ যায় প্রায় দেড়শ টাকার মত আর বাইরে এই মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার একশ টাকা দরে।’
এ ব্যাপারে পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শামছুল হক বলেন, ‘পঞ্চগড়ের মাটি এবং আবহাওয়া মরিচ চাষের উপযোগী হওয়ায় এ জেলায় প্রচুর মরিচ চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনও হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ, যা এই জেলার চাহিদায় কয়েক গুণ বেশী। ফলে এ জেলায় উৎপাদিত মরিচ দেশের বিভিন্ন এলাকার চাহিদা পুরনে বিশেষ ভুমিকা রাখবে।,
তবে, সব ক্ষেত থেকে এক সাথে মরিচ সংগ্রহ হওয়ায় এবং ফলন বেশি হওয়ায় গত বছরের তুলনায় এবার দাম কম বলে জানান তিনি।
ডিআর/৮৪

শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।